বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

জুলাই হামলায় জাবিতে শাস্তি ১৩ শিক্ষক-কর্মকর্তার, অব্যাহতি ৮ জনের

জুলাই আন্দোলনের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে দীর্ঘ তদন্ত শেষে একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রায় এক বছর ধরে চলা অনুসন্ধান, অভিযোগ পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ তিন কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্ত কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, অভিযোগের মুখে থাকা ২১ জনের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া শেষে ১৩ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় আটজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা সিন্ডিকেট সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত করা, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা এবং বেতন নিম্নধাপে পুনর্নির্ধারণের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতির শাস্তিও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কারণেই তদন্তের প্রতিটি ধাপ যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন শিক্ষককে বেতন অবনমন, প্রশাসনিক দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ স্থগিতের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

আরও কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পদাবনতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভবিষ্যতে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পুনরায় পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুই শিক্ষককে সতর্কীকরণ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনকে আগামী পাঁচ বছর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় আটজন শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর সিন্ডিকেট এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তির মুখোমুখি না হন এবং কোনো দায়ী ব্যক্তি যেন দায়মুক্তি না পান, সে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে প্রথমে অভিযোগ যাচাই করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে পৃথক প্রক্রিয়ায় শুনানি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করা হয়। সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং কোষাধ্যক্ষের ভূমিকাও উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পৃথক কাঠামোগত তদন্ত শুরু হয়নি। ফলে সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাঁদের প্রত্যেকের বিষয়ে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। সর্বশেষ সিন্ডিকেটের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঘটনাটির প্রশাসনিক তদন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাল। তবে শাস্তিপ্রাপ্তদের প্রতিক্রিয়া, সম্ভাব্য আপিল এবং নতুন তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি।

শিক্ষাঙ্গনে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার প্রশ্নে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তাঁদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

আরো